চোখ জুড়ানো নীল জলরাশি আর পৌরাণিক কথায় মোড়া দক্ষিণী বারান্দা – রামেশ্বরম

0
545

ট্রেন থেকে নেমে গুগল ম্যাপে নিজের অবস্থান জানতে ক্লিক করলেই চোখে পড়বে চারপাশে সমুদ্র। আপনি তখন পৌঁছে গেছেন ভারতের শেষ সীমানায়। তিনটি সাগরের পূণ্য মিলনস্থল পৌরাণিক কথকতায় মোড়া কন্যাকুমারী, দক্ষিণে ভারতবর্ষের শেষ স্থলভূমি৷ তবে তার আগে অবশ্যই পৌঁছে যান রামেশ্বরম, অনেক চমক সেখানে অপেক্ষা করে আছে।

ভারতের মূল স্থলভূমির থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ হলো তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম, ওখানে পৌঁছালেই বোঝা যায় শহুরে ছোঁয়াচ এখনও স্পর্শ করেনি ডঃ এপিজে আব্দুল কালামের এই পুণ্যভূমিকে৷ মোটামুটি দুদিনে ভালোভাবে ঘুরে দেখে নেওয়া যায় রামেশ্বরম। মোটামুটি ভাবে বিশেষ দ্রষ্টব্য গুলি হলো রামেশ্বরম মন্দির, এপিজে আব্দুল কালাম মিউজিয়াম ( এখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন ডঃ কালাম), ধনুষকোডি বিচ, পামবান সেতু, এবং অবশ্যই ডঃ কালামের বাড়ি। এছাড়াও বেশ কিছু ছোটো বড় মন্দির আছে, যেগুলি নিয়ে অনেক পৌরাণিক কথা শোনা যায়।


দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন‍্যতম শ্রী রামেশ্বরম।তামিলনাড়ুর রামেশ্বরে অবস্থিত এই রামেশ্বরম জ্যোতির্লিঙ্গ চারধামের মধ্যে অন্যতম ধাম।একে দক্ষিণ ভারতের কাশীও বলা হয়।দক্ষিণ-পূর্ব ভারতের শেষ প্রান্তভূমি পক প্রণালীতে একটি দ্বীপের আকারে গড়ে উঠেছে রামেশ্বরম। রামেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গটি বিশাল। এই মন্দিরে রামেশ্বর স্তম্ভ অবস্থিত।সারা বছর ধরেই অসংখ্য পুণ্যার্থী এখানে পূজা দিতে আসে। মন্দির সৃষ্টির পৌরানিক ব্যাখ্যা থেকে যেটুকু জানা যায় তাতে বলা হয় সীতার বালি দ্বারা নির্মিত মূর্তি ও রামচন্দ্রের প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ স্থাপিত রয়েছে এই মন্দিরে। এই মন্দিরে নাকি দুটি লিঙ্গ আছে বলে মনে করা হয়।একটি সীতা পূজা করতেন।অন্যটি পূজা করতেন হনুমান।লঙ্কা জয় করে আসার পর এই পূজা করেন সীতা ও হনুমান। কথিত রয়েছে দিনের শুরুতে নারায়ন রামেশ্বরমে স্নান করেন। দ্বারকা তে নববেশ ধারন করেন। বদরি নারায়নে ধ্যান করেন। পুরীতে খাবার খান। পুনরায় ফেরেন দ্বারকাতে, তখন শয়ন করেন।


অর্থাৎ চারধামের এক ধাম এই রামেশ্বরম মন্দির। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি বীর হনুমানের দ্বারা সেতুবন্ধনের এই ভাসমান পাথর পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না।


ট্রেনে করে রামেশ্বরম পৌঁছালে বিকেলের দিকে একবার অবশ্যই গাড়ি নিয়ে চলে যান পামবান ব্রিজ৷ দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ-নীল জলরাশি মনের সমস্ত ক্লান্তি, অবসাদ কে এক নিমেষে দূর করে দেবে।


দ্বিতীয় দিনে প্রথমেই লিস্টে থাকুক ধনুষকোডি৷ ভারতের সবচেয়ে দক্ষিণের শহর ধনুষকোডি। যদিও এখন সে শহর জনমানবহীন। তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম জেলার এই দ্বীপ-শহর এমন একটা জায়গা, যেখানে প্রকৃতি এবং মানুষের বিস্ময়ের মেলবন্ধন ঘটেছে। আর বিস্ময়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিশেলের জন্য এই ভুতুড়ে শহরের পর্যটকদের কাছে ব্যাপক চাহিদা। এই শহর থেকে শ্রীলঙ্কার দূরত্ব মাত্র ২৪ কিলোমিটার।

১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এই শহরের উপর দিয়েই ভারত আর শ্রীলঙ্কার মধ্যে নিত্য যাতায়াত ছিল সাধারণ মানুষজনের। কখনও ব্যবসা, কখনও তীর্থের জন্য সেখানে যেতেন অনেকে। তার জন্য ধনুষকোডি থেকে শ্রীলঙ্কার শহর তালাইমানারের মধ্যে ফেরি পরিষেবাও ছিল। তখনও দু’দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা গড়ে ওঠেনি। ফলে যাতায়াতে বাধানিষেধও ছিল না।

দু’দেশের মধ্যে ১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক জলসীমান্ত চুক্তি হয়। হিসাব মতো এর পরই দু’দেশের মধ্যে এই যাতায়াত বন্ধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে তার অন্তত ১০ বছর আগে। একটা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর। এই ঘূর্ণিঝড়ই লণ্ডভণ্ড করে দেয় শহরটাকে। ১৯৬৪ সালের ২২-২৩ ডিসেম্বরের সেই ঘূর্ণিঝড় রামেশ্বরম সাইক্লোন বা ধনুষকোডি সাইক্লোন বলে পরিচিত। যা ২৮০ কিলোমিটার গতিবেগে বয়ে গিয়েছিল শহরটার উপর দিয়ে। দ্বীপ শহর ধনুষকোডির ২৩ ফুট উপরে লাফিয়ে উঠেছিল সমুদ্রের জলরাশি।লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল গোটা এলাকা। শহরের বেশির ভাগটাই চলে গিয়েছিল জলের তলায়। অন্তত ১৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। জানা যায়, ১১৫ যাত্রী নিয়ে রামেশ্বরমের পাম্বান থেকে ধনুষকোডি পর্যন্ত একটি যাত্রীবাহী ট্রেন যাচ্ছিল সে সময়। ঘূর্ণিঝড়ে ট্রেনের সমস্ত যাত্রীই মারা যান। পাম্বান থেকে ধনুষকোডি পর্যন্ত একটা রেলব্রিজ ছিল। সেটাও পুরো ধ্বংস হয়ে যায়। ক’জন মানুষ বেঁচে ছিলেন, তাঁরাও প্রাণভয়ে শহর ছেড়ে চলে আসেন তামিলনাড়ুর মূল ভূখণ্ডে।

এর পরই তামিলনাড়ু সরকার শহরটাকে ‘ঘোস্ট টাউন’ বা ভুতুড়ে শহর হিসাবে ঘোষণা করে দেয়। এগুলো ছাড়াও আরও একটা কারণে বেশ জনপ্রিয় ধনুষকোডি। আর সেই কারণ হল রাম সেতু। অনেকের ধারণা, এই ধনুষকোডি থেকেই বানর সেনার সাহায্যে শ্রীলঙ্কা যাওয়ার রাস্তা বানিয়েছিলেন রাম।

রামেশ্বরম থেকে সাড়ে সাত ঘন্টার ট্রেন জার্নি তে পৌঁছে যাওয়া যায় কন্যাকুমারী। এ ছাড়া হাওড়া থেকে সরাসরি ট্রেনে পৌঁছে যাওয়া যায় ‘কেপকমরিন’। আগে কন্যাকুমারী এ নামেই পরিচিত ছিল। দক্ষিণ ভারতে মূল ভূ-খণ্ডের সর্বশেষ বিন্দু কন্যাকুমারী ইতিহাসসমৃদ্ধ তো বটেই, পর্যটকদেরও চোখের মণি। প্রথম দর্শনীয় স্থান সমুদ্রসৈকত থেকে বেশ খানিক উপরে কন্যাকুমারী মায়ের মন্দির। কুমারী মহামায়ার আরাধনায় উৎসর্গীকৃত এই মন্দির তিন হাজার বছরের পুরনো।

মায়ের দর্শন শেষে মন্দির থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যান সমুদ্রের পাড়ে। উত্তাল সমুদ্রে জলোচ্ছ্বাস। পাড়ের কাছে দূর থেকে ছুটে আসা সাদা ঢেউয়ের মালা সশব্দে আছড়ে পড়ছে পাথরের গায়ে। এলোপাথাড়ি ভাবে ভিজিয়ে দিচ্ছে হলুদ বালিয়াড়ি। সূর্যের তাপ একটু স্নিগ্ধ হতেই ভিড় জমতে শুরু করে সৈকতে। কিছু সময় পর সূর্য যখন পশ্চিমের পথে, গোধূলির শেষ আলোয় চারদিকে তখন চোখ জুড়ানো রঙের বাহার। কন্যাকুমারীর সূর্যাস্ত দীর্ঘকাল থেকে যাবে আপনার মনের মনিকোঠায়।

ভোর ভোর ঘুম ভেঙে পায়ে হেঁটে চলে যান বিবেকানন্দ রকের উদ্দেশ্য, ভোরের নরম আলোয় ফেরিঘাটের দীর্ঘ অলিগলি ঘুরে শেষে লাইফ জ্যাকেট পরে লঞ্চে চেপে চঞ্চল সমুদ্রের বুকে মোচার খোলার মতো দুলতে দুলতে পৌঁছে যান বিবেকানন্দ রক। দেবী কন্যাকুমারীর পদস্পর্শ ধন্য এই পাথর পুরাণের কাল থেকেই পবিত্র স্থান হিসেবে সমাদৃত।

সারা ভারত পরিক্রমার পর ১৮৯২ সালের ২৪, ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর এ জায়গাতেই স্বামী বিবেকানন্দ গভীর ধ্যান শেষে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। বিবেকানন্দ স্মৃতিরক্ষা সমিতির উদ্যোগে এই শিলার উপর নির্মিত হয়েছে ‘বিবেকানন্দ স্মৃতিমন্দির’ ও ‘শ্রীপদমন্দির’। অশান্ত সমুদ্রের মাঝে এক পরম প্রশান্তির স্পর্শ। ধ্যানগৃহের অন্ধকারে স্নিগ্ধ সবুজ আলোয় ‘ওঁ’ শব্দের বিচ্ছুরণ ও গম্ভীর ধ্বনি এক ঝটকায় বাইরের জগত্ থেকে মনকে পৌঁছে দেয় আত্মার অন্তঃস্থলে। এর পর একে একে ঘুরে দেখা যায় বিবেকানন্দ প্রদর্শনী, সূচিন্দ্রম মন্দির, মোম সংগ্রহশালা ও পদ্মনাভ প্যালেস।

ইতিহাসের পাতায় ঘোরাঘুরির শেষে এ বার চলে আসা ত্রিবেণী সঙ্গমে। এখানে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, আরব সাগর একে অপরের সঙ্গে মিশেছে। জলে জলে জলাকার। আর তার মাঝেই নিশ্চিন্তে ডুবে গেল সূর্য। এমন মনোহর দৃশ্য জীবনের মতো গেঁথে যাবে স্মৃতির মণিকোঠায়।

কীভাবে যাবেন

রেল পরিষেবার মাধ্যমে তামিলনাড়ু ভারতের সব ক’টি গুরুত্বপূর্ণ শহরের সঙ্গে সংযুক্ত।
• রামেশ্বরমে হাওড়া থেকে বা পূর্ব ভারত থেকে সরাসরি ট্রেন আসেনা, বরং আসুন মাদুরাই হয়ে, হাতে একবেলা রেখে দেখে নিন অন্যতম দ্রষ্টব্য মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী দেবী মন্দির৷ রামেশ্বরম থেকে কন্যাকুমারীর সরাসরি ট্রেন আছে। বিমানে আসতে হলে নিকটবর্তী বিমানবন্দর হলো ত্রিবান্দম৷

কোথায় থাকবেন

তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী ও রামেশ্বরমে আছে বিভিন্ন দামের অঢেল হোটেল ব্যবস্থা।

দেশি-বিদেশি নানারকম খাবারই মিলবে হোটেল ও রেস্তোরাঁয়। তবে দোসা, ইডলি, উপমা, বড়া জাতীয় দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের প্রাধান্যই বেশি।

উপযুক্ত সময়

অক্টোবর থেকে মার্চ।

যেহেতু সমুদ্র এলাকা সেজন্য সুতির জামাকাপড়, রোদটুপি, চশমা ও অবশ্যই সানস্ক্রিন লোশান ব্যাগে থাকা মাস্ট

ভ্রমণ মানুষের মনের অন্ধকার দূর করে, নতুন করা চলার রসদ যোগায়। চটপট ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিন, আপনার অপেক্ষায় আছে এই দক্ষিণী বারান্দা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে