প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কিছু প্রস্তাব – রাজা দেবরায় (আগরতলা, ত্রিপুরা)

0
326

১) শুনতে অন্যরকম মনে হলেও বাস্তবতা এবং পরিস্থিতির নিরিখে বিচার করলে বোঝা যাবে যে একইরকম সিলেবাস সর্বত্র পড়ালে সামগ্রিকভাবে খুব একটা সাফল্য আসবে না বা আসেও না । যে স্কুলের অধিকাংশ স্টুডেন্টরা তুলনামূলকভাবে পড়াশুনায় দুর্বল, তাদের যেকোন বিষয়েরই তৈরী করে দেওয়া বা চাপিয়ে দেওয়া সিলেবাস কোন কাজে আসে না । পড়ানোর জন্যই শুধুমাত্র পড়ানো হয়ে থাকে । যে স্টুডেন্টরা সঠিকভাবে অ-আ, ক-খ, A-B-C-D, ০-৯ এগুলো ঠিকঠাকভাবে পারে না বা শেখে নি, তাদের বাংলা ও ইংরেজী গল্প, কবিতা, প্রশ্নের উত্তর বা গণিতের যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ ক্লাসে করিয়ে দিলে কী লাভ হবে ? আর লেসন প্ল্যান, টিচারস ডাইরী, সর্বোপরি সিলেবাস শেষ করার চাপ শ্রদ্ধেয় টিচারদের থাকায় তারাও অসহায় হয়ে পড়েন এই ক্ষেত্রে । বেসিকগুলো পড়ালে সিলেবাস শেষ হবে না । আবার লেসন প্ল্যান, টিচারস ডাইরীও সঠিকভাবে মেনটেন করাও সম্ভব হবে না । অনেক স্কুলই পরীক্ষার প্রশ্ন নিজেরা তৈরী করতে পারেন না । একটি ইউনিট থেকে প্রশ্নগুলো আসে । ফলে সিলেবাস শেষ করতেই হয় সম্মানিত টিচারদের । সিলেবাস শেষ না করলে শিক্ষাদপ্তর, সম্মানিত অভিভাবকগণও চেপে ধরবেন টিচারদের । এখন শ্রদ্ধেয় টিচাররা কী করবেন ? সঠিক শিক্ষা দিতে হলে সিলেবাস ভুলে যেতে হবে নতুবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুশাসনে সিলেবাস শেষ করার দিকেই মনোনিবেশ করতে হবে, তাতে স্টুডেন্টরা প্রকৃত শিক্ষা না পেলেও কি করা !! একেক জায়গার জন্য ভিন্ন বই বা সিলেবাস হয়তো করা সম্ভব না, নানাকারণেই তা সম্ভব নাও হতে পারে । কিন্তু যেই যেই স্কুলে এরকম সমস্যা সেগুলোতে শ্রদ্ধেয় টিচারদের তো স্বাধীনতা দেওয়াই যেতে পারে । এতে টিচাররাও পরিকল্পনামাফিক সঠিক শিক্ষা দিতে পারবেন । কারণ ক্লাস ওয়ান ও টু-তে তো কোন পরীক্ষা নেই বা অনেক স্কুলে হয়তো আছে । যদিও নতুন নিয়মে কী হবে বা হয়েছে জানা নেই । তাছাড়া ক্লাস ফাইভের আগে তো কোন পাশ-ফেল নেই, যদিও এখন পর্যন্ত দেশের সব বিদ্যালয়ে লাগু হয়নি বলেই মনে হয় । মোটামুটিভাবে অনেক বিদ্যালয়েই এখনো পর্যন্ত ক্লাস এইট পর্যন্ত ‘নো ডিটেনশন পলিসি’ চলছে । তবে এই সুযোগটাকে তুলনামূলক দুর্বল স্টুডেন্টদের স্বার্থে ভালোভাবে কাজে লাগানো যেতেই পারে ।

২) অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় স্টুডেন্টরা ইমেজ হিসেবে কোন কিছু লিখতে শিখছে । আবার অনেক সময় দেখা যায় অ-আ, ক-খ, A-B-C-D, ০-৯ ইত্যাদি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বলতে পারলেও মাঝখান থেকে কোন বর্ণ বা সংখ্যা ব্ল্যাকবোর্ডে লিখলে বলতে পারে না । সঠিক শিক্ষার জন্য সেগুলোর দিকে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন । বাংলা ও ইংরেজী বর্ণমালা বা সংখ্যার বিভিন্ন ব্লক কিনতে পাওয়া যায় । সেগুলোকেও খুব ভালোভাবে কাজে লাগানো যায় । অনেক স্কুল কাজে লাগায়ও ।

৩) সরকারী প্রাক-প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষত অঙ্গনওয়াড়ি সেন্টারগুলোতে আরো বেশী তদারকির প্রয়োজন আছে । বেশী বেশী ট্রেনিংয়ের দরকার । এই সেন্টারগুলোতে খেলার ছলে পড়াশুনা শেখানোর সিস্টেমে ঘাটতি আছে বলেই মনে হয় ।

৪) শ্রদ্ধেয় টিচারদের কাছ থেকে নিয়মিত অভিজ্ঞতা এবং সাজেশন নিতে হবে । কারণ সম্মানিত টিচাররাই সবথেকে ভালো বলতে পারবেন স্টুডেন্টদের ব্যাপারে এবং শিক্ষা পদ্ধতির ব্যাপারে ।

৫) শ্রদ্ধেয় টিচারদের শিশু মনস্তত্ত্ব বিষয়ে বেশী বেশী ট্রেনিং দেওয়া প্রয়োজন । ডি.এল.এড. এবং বি.এড.-এ এই বিষয়ে পড়াশোনা থাকলেও নিয়মিত প্রয়োজন ।

৬) শ্রদ্ধেয় টিচারদের পড়ানোর বিষয়ে অধিক স্বাধীনতা দিতে হবে ।

৭) শ্রদ্ধেয় টিচারদের নিজ বাড়ি থেকে খুব দূরবর্তী বিদ্যালয়ে যাতায়াতের খরচ সরকার বহন করলে ভালো । যেমন – বাস বা ট্রেনের খরচ ।

৮) স্কুলে অন্যান্য বিষয়গুলোর মতো আর্ট, গান, নাচ, আবৃত্তি, বিভিন্ন খেলাধুলা ইত্যাদি মূল বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হোক ।

৯) সপ্তাহে অন্তত একদিন বা এক পিরিয়ড ‘ভাবনা-চর্চা’ থাকুক । যেমন বাচ্চাদের বলা হলো – তোমাকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তুমি কী কী পরিবর্তন করবে বা কী কী সংযোজন করবে যার ফলে স্কুলের আরো ভালো হবে ইত্যাদি । তারা বলবে বা লিখবে ।

১০) প্রত্যেকটি স্টুডেন্টকে সম্মান দিতে হবে ক্লাসে । ক্লাসরুম ডেকোরেটিভ হতে হবে । জল, শৌচালয় ইত্যাদির সুবন্দোবস্ত থাকতে হবে । অসংখ্য টিচিং লার্নিং ম্যাটেরিয়েলস থাকতে হবে । খেলার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকতে হবে । তবেই উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হবে । পরিশেষে, মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের মাননীয় মন্ত্রী, সব রাজ্যের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাদপ্তরের কাছে বিনীত অনুরোধ থাকবে শ্রদ্ধেয় টিচারদের অমূল্য অভিজ্ঞতা, যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাবগুলো যেন লিপিবদ্ধ করা হয় এবং এগুলো যেন উপযুক্ত মর্যাদা পায় ।।

আরোও পড়ুন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে